Join our upcoming 5 day Residential to explore The Art of Being Human.
Learn MoreRead inspiring stories and cultural insights from around the globe.
Read NowExperience electrifying notes of music celebrating rhythm and culture.
Explore
একটি চিত্রকাহিনী ও অনেক ঘটনা
ঋত্বিক ঘটকের ছবি ‘মেঘে ঢাকা তারা’। ছবির নায়িকা মেধাবী ছাত্রী নীতা নিজের পড়াশোনা আর ব্যক্তিগত স্বপ্ন ছেড়ে দিয়ে তার সামান্য চাকরির আয়ে পরিবারের বাকি পাঁচজন আর তার বাইরে প্রেমিকের পড়াশোনার স্বপ্ন পূরণ করার অসাধ্যসাধনে নেমে অনেকটাই করে ফেলেছিল বটে, তবে সেই তীর্থের যাত্রাপথে প্রেমিক অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে নীতার বোনের দিকে ঢলে পড়ে, বোনও ন্যক্কারজনক বিশ্বাসঘাতকতা করে দিদির প্রেমিককে বিয়ে করে। ত্যাগমার্গে কাঙ্গাল হয়ে যেতে যেতে যক্ষ্মায় আক্রান্ত নীতা গৃহচ্যূত হয়ে নিশ্চিৎ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ায়। ছবিটি শেষ হয় নীতার সাধারণ জীবনে ফেরার, বাঁচতে চাওয়ার হাহাকার… আকুতিভরা কান্নায়।
নীতার এই ত্যাগ যখন তাকে মহত্বের এক উঁচু পাদপীঠে দাঁড় করিয়ে দেয়, প্রশ্ন ওঠে আশপাশের মানুষজনের কী হল? আশা হয়, নীতাকে দেখে তারা অনুপ্রাণিত হয়ে উদারহৃদয় ভালো মানুষ হবে। কিন্তু, অবাক হয়ে দেখি অযৌক্তিক সুবিধে নিতে নিতে তারা প্রায় সকলেই নীচুস্তরের বিবেকহীন স্বার্থপরে পরিণত হয়েছে। এমন কি সকলের মধ্যে যে ভালো, শিল্পীমনের সেই দাদাটিও তার স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা হারিয়েছে, নিজের মা-ও ব্যতিক্রম নন।
কলকাতার স্কলারশিপ অফিস, ১৯৭০-এর দশক। ইউনিয়নের নেতা এক ভদ্রলোক সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে ছাত্রদের স্কলারশিপ পৌঁছনোর ব্যবস্থা করেও সব কাজ শেষ করতে পারছেন না, বাকি কর্মচারীরা বাইরে চা- সিগারেট খাচ্ছেন, নিজস্ব সচেতনতায় ফুলে যে কাজটির জন্য মাসে মাসে মাইনে পাচ্ছেন সেটিকে বাদ দিয়ে দুনিয়ার সমস্ত বিষয়ে আলোকপাত করছেন। অনেক ছাত্র আদৌ স্কলারশিপ পাচ্ছে না, যারা পাচ্ছে তাদেরও পেতে দেরি হচ্ছে, তাতে তাঁদের কোন হেলদোল নেই।
নেতা সারাদিন অফিসের সম্মানরক্ষার কাজ ও পরে ইউনিয়নের বড় অফিসে হাজিরা দিয়ে যখন ফিরছেন, বাড়িতে বাচ্চারা ঘুমিয়ে। নিজের খাওয়া-দাওয়ার ঠিক নেই, স্ত্রীরও এক অবস্থা। বাবার প্রায় অনুপস্থিতিতে এঁর সন্তানদের ঠিক ভাবে বেড়ে ওঠার সম্ভাবনা যারা অফিসে আড্ডা মেরে সময়ের আগেই বাড়ি পৌঁছে জান, তাঁদের সন্তানদের তেমন সঙ্কট হবার সম্ভাবনা কম। সরকারী কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা, কাজ না করলেও মাইনে আটকাবে না- মনোভাব তাঁদের সাধারণ মানুষের প্রতি এমন কি নিজেদের নিষ্ঠাবান সহকর্মীদের প্রতিও নিষ্ঠুর করে তোলে।
চেন্নাইএর কেন্দ্রীয় সরকারী অফিস- বামপন্থী ইউনিয়নের নেতা সহকর্মীর চৌর্যবৃত্তির শাস্তি যাতে না হয় তার জন্য যার টাকা চুরি হয়েছে তাকেই শাসিয়ে বেড়াচ্ছেন। বলছেন, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আমাদের ইউনিয়নের সদস্য। অভিযোগ সত্যি হোক বা মিথ্যে- আমরা তাকেই সমর্থন করব। কর্মীদের অন্যায়ের প্রতি এই ধরণের সমর্থন-ই সরকারী সংস্থাকে দুর্বল করে তাদের বেসরকারিকরণ বা বিলুপ্তির পথ সুগম করেছে। যার ফলে ফাঁকিবাজ কর্মচারীদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাবা-মা’র মত ‘আরামের’ চাকরি বহু দূরের দ্বীপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সহকর্মীদের বিবেকহীন ফাঁকিবাজি দেখে ব্যথিত এক বর্ষীয়ান কর্মচারী ত্রিপুরার ধর্মনগর- ইউনিয়ন মিটিং-এ বললেন, নতুন দাবীদাওয়া পেশ করার সাথে সাথে আমাদের শপথ নেওয়া উচিৎ যে অফিসের আট ঘন্টা সময়ের মধ্যে আমরা প্রত্যেকে অন্ততঃ পাঁচ ঘণ্টা কাজ করব। ফলতঃ, নেতা-কর্মীরা রুষ্ট হয়ে তাঁকে বয়কট করলেন। তারও কয়েক বছর পর অফিসে অফিসে আলস্যের বান আর সাধারণ মানুষের হয়রানি দেখে ইউনিয়নের বড়দা রাজনৈতিক নেতা কর্মসংস্কৃতি ফেরানোর আবেদন করলেন। কেউ কর্ণপাত করলো না।
আগরতলায় সরকারী সংস্থা। অফিসের এক বস সব কাজ করে যুবা সহকর্মীদের দেখিয়ে বলছেন, সব কাজ এরাই করেছে। এর ফলে চিরশিশু মনোভাবের তরুণ বয়সীরা কাজ না শিখে, অভিজ্ঞ বয়স্কদের ঘাড়ে চড়ে জীবন কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তাদের কাঁধে চড়িয়ে নদী পার করানো বস বিলাপ করেন, এই জেনারেশনই অলস, কর্মবিমুখ।
স্নেহশীল অভিভাবকের আগলে রাখা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী সন্তান কর্মক্ষেত্রে নিজের তথাকথিত ‘উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতি’ পূর্ণ করার চেষ্টায় নাজেহাল, ক্লান্ত। অভিভাবকদের কাছ থেকে ভৃত্যের মত সেবা পাওয়ায় পড়াশোনার সীমিত ক্ষেত্র ছাড়া তারা খুব সাধারণ কাজও- যেমন, বাজার থেকে সব্জি কেনা--করতে পারে না। বাড়ির বাইরের কোন মানুষের সাথে বিশেষ মেলামেশা করতে না শেখার জন্য সুবিধে করতে পারে না বয়ঃপ্রাপ্তির পর ঘাড়ে এসে পড়া অবধারিত সেই কাজটিতে। আই এ এস কোচ বিকাশ দিব্যকীর্তি তাঁর ক্লাসে এই সঙ্কটটি এরকম ভাবে বুঝিয়েছেন-
একটি ছেলে পড়াশোনায় রত্নবিশেষ। ফোকাস চলে যাবার ভয়ে কোন দিন বন্ধুদের সাথে সিনেমায় যায় নি। আই আই টি’র গোল্ড মেডেল পেয়ে আই আই এম-এ ঢোকার ইন্ট্রো সেশনে একটি মেয়ে তার পাশে বসেছিল। মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার নাম কী?’ ছেলেটি একটু সরে বসলো আর বললো ‘আমার আগ্রহ নেই’। সে জানে যে, কোন মেয়ে তার সাথে কথা বলা মানে সে প্রেম করতে চায়, তাতে জড়িয়ে পড়লে গ্রেড কমে যাবে। আর গ্রেড না পেলে জীবনে বড় হওয়াও যাবে না।
এই ছেলেটি পরে বেশ উঁচু মাইনের চাকরি পেল। সেই কোম্পানিতে তার স্কুলের সহপাঠী একটি ‘মাঝারি’ বুদ্ধির ছেলেও ‘মাঝারি’ কলেজ থেকে পাস করে একই সাথে কম মাইনেতে ঢুকলো। পাঁচ বছর পরে প্রথম ছেলেটি দেখে দ্বিতীয় ছেলেটি টপাটপ প্রমোশন পেয়ে প্রায় তার সমান র্যাঙ্ক-এ উঠে এল। পরে তাকে ছাড়িয়েও গেল। সে কিছুতেই বুঝতে পারে না, কম নম্বর পাওয়া সত্ত্বেও দ্বিতীয় জন কী করে এত ভাল করতে পারে?
দিব্যকীর্তি বলতে চেয়েছেন, জীবনের সিলেবাস, পড়ার বইয়ের বাইরে উপছে পড়ে। বাইরের ঘাত-প্রতিঘাত থেকে স্নেহভাজনদের বাঁচাতে গিয়ে অভিভাবকরা নিজেরা খেটে মরেন আর পরবর্তী প্রজন্মকে অকেজো করে ফেলেন।
পুষ্টিকর খাবার, জগিং বা জিম যত ভালই লাগুক না, সীমা ছাড়িয়ে গেলেই শরীরের ক্ষতি করে। আপাতদৃষ্টিতে স্বার্থহীন মানুষরা সন্তানের দোষ ঢাকতে ব্যাকুল মায়ের মত, ভুবনের গল্পের মাসীর মত। এদের দেখেই বোধ হয় বারট্রান্ড রাসেল লিখেছিলেন, বাচ্চাদের গোল্লায় যাবার জন্য বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তাদের মায়েরাই দায়ী। মনে হয়, সরকারী অফিসগুলোর অধঃপতনের একটি বড় কারণ এই মাতৃপ্রতিম মানুষরা। নিজের অঞ্চলছায়ায় দোষ ঢেকে তাঁরা প্রিয়জনদের করে তোলেন পরনির্ভরশীল, বহির্বিশ্বে কাজের অযোগ্য। এই প্রক্রিয়ায় এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি হয় যেখানে আত্মবিশ্বাসহীন মানুষ নিজেদের কাজ করে দেবার জন্য বসে থাকে কোন মহামানবের আবির্ভাবের আশায়।
মানুষ আত্মত্যাগের জন্য অনুসরণযোগ্য সহজ উদাহরণ না পেলে কাজটির দিকে আর না তাকিয়ে সিরিয়াল দেখতে বা ইনস্টাগ্রাম সার্ফিং করতে বসে যায়- এটিই রুঢ় বাস্তব। ওপরের ১ থেকে ৫ পর্যন্ত প্রতিটি উদাহরণে দেখুন, আত্মত্যাগীদের চারপাশে পরজীবী, অকর্মণ্য তৈরি হচ্ছে। তার কারণ অননুকরণীয় আত্মবঞ্চনা দেখে সাধারণের মনোভাব দাঁড়ায় - ‘উনি পারেন, আমাদের দ্বারা হবে না’।
ত্যাগীদের যদি জিজ্ঞেস করেন (আমি জিজ্ঞেস করে দেখেছি), ‘এমন করেন কেন? কী চান?’ তাঁদের অনেকেই বলবেন, ‘মানুষ ভাল বলুক এটুকু চাই।’ (আমি এই উত্তর বাস্তবে পেয়েছি।) অর্থাৎ, ত্যাগ সম্পূর্ণ স্বার্থচিন্তা বিহীন নয়- কেউ চায় টাকা, কেউ চায় সুনাম।
মনোবিজ্ঞানী কার্লো এম সিপোলা মানবসমাজকে চারটি শ্রেণীতে ভাগ করেন (ছবি নীচে)। আত্মত্যাগীরা সিপোলার ছবির বাঁ দিকের ওপরে ‘নিজেরা কষ্টস্বীকার করে অন্যের উপকার করছি’ ভাব নিয়ে থাকতে চান। কিন্তু, তাঁদের যথার্থ অবস্থান তার নীচের ভাগটিতে, যেখানকার মানুষ অজান্তেই নিজের সাথে সমাজের ক্ষতি করে ফেলে।
আত্মত্যাগ অবশ্যই ভালো। তবে, বাড়াবাড়ি হলে ভালও খারাপ হয়ে দাঁড়ায়। তাই, একগুঁয়ের মতো ত্যাগ করতে থাকাই সব নয়। কী উদ্দেশ্যে ত্যাগ করা হচ্ছে এবং ত্যাগের ফলাফল কী হচ্ছে—এই দুটোই খেয়াল রাখতে হবে। এ কথা সংবেদনশীল ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অভিজিৎ ব্যানার্জি ও এস্থার ডাফলো’র বই পুয়োর ইকনমিকস‑এ দেখানো হয়েছে যে ক্ষুধার্ত ও হতদরিদ্রদের মৌলিক চাহিদা না মেটাতে পারলে তারা কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগোতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, স্কুলের মাইনে দিতে পারে না, পেট ভরে খেতে পায় না এমন একটি শিশুকে সাহায্য করলে সে পরে কর্মদক্ষ হয়ে উপার্জন শুরু করবে, জিডিপিতে অবদান রাখবে এবং কর দিয়ে জনকল্যাণে অংশ নেবে। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারীর সময় মানুষ প্রায়শঃ আত্মত্যাগীদের ওপর নির্ভর করে; তাই আমরা বিভিন্ন মিশন ও সংগঠন এবং তাদের সদিচ্ছাকে রক্ষা করার চেষ্টা করি। তবে দুর্যোগ কেটে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেই সহায়তা ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়ে স্থানীয় সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
মার্চ, ২০২৬ -অরিজিৎ চৌধুরী
তথ্যসূত্র-
Read more reflections on life, art, and the human spirit from our contributors.
Join us in promoting cross-cultural dialogue, preserving heritage, and fostering global collaborations through art, literature, music, and festivals.