মৃত্যুই জীবন

ManavNama
an Inquiry

Join our upcoming 5 day Residential to explore The Art of Being Human.

Learn More

Melange
Our Blogs

Read inspiring stories and cultural insights from around the globe.

Read Now

Jazbaat
Festival

Experience electrifying notes of music celebrating rhythm and culture.

Explore

Death to Life....

আদিত্য আর নীলার বিবাহিত জীবনটা একদম ঝকঝকে। কোথাও কোনো সমস্যা নেই। ছেলে মেয়ে সব বড় হয়ে গেছে। তাদের জীবন তাদের মত, নীলা বা আদিত্যর তেমন দায়িত্ব নেই আর। এখন শুধু দুজনে।

যতদিন সন্তানরা সঙ্গে থাকে, ততদিন নিজেদের এটা ওটা অনেক ব্যস্ততা, কাজকর্ম থাকে, এখন নীলার বয়েস পঞ্চান্ন আর আদিত্যর ষাট। আদিত্য প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছে একসময়, এখন অবসর নেবার পর বাড়িতেই থাকে। টাকা পয়সা যা পেয়েছে, তাতে ভালোভাবেই বাকী জীবনটা কেটে যাবে। নীলা ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। তার নিজের মত করেই সে জীবন কাটায়। অনেকসময় অফিসের পরেও দেরী করে বাড়ী ফেরে। কারণ আদিত্য চায় না, সে বাড়ীতে থাকার সময় নীলা বাইরে থাকুক। আদিত্য যেটা চায়, নীলা কোনোদিন সেটা বুঝতে পারলেও করে না, বরং এমন একটা কাজ করে, যেটার জন্যে আদিত্যকে অনেক কষ্ট করে মানিয়ে নিয়ে চলতে হয়। নীলা আদিত্যকে নিজের ব্যস্ততা দেখায় সবসময়, হয়তো তেমন কাজ নেই, তবুও

ব্যাঙ্কের লোকেদের নিয়ে ফালতু কথা, অকাজের মিটিং, ফুর্তির খাওয়া দাওয়া, কাজ নেই তাই পিকনিক, যখন তখন এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়ানো, এইসব করে। যার ফলে একটু একটু করে দুজনের মাঝে একটা দূরত্ব তৈরী হয়েছে, যেটা আদিত্য বোঝে, নীলা বুঝেও বোঝে না।

একদিন রাত ন'টায় থানা থেকে ফোন এল নীলার, আদিত্য সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে পড়লো। গিয়ে দেখে, একজন বয়স্ক কিন্তু শক্ত পোক্ত মানুষের সঙ্গে নীলা উত্তেজিত ভাবে ঝগড়া করছে। অফিসার দুজনকেই বোঝাবার চেষ্টা করে যাচ্ছে, কেউ শুনছে না। নীলা ওই মানুষটির গাড়িতে ধাক্কা মেরেছে বলেই বচসা চলছে। উনি এখুনি পঁচিশ হাজার টাকা চান, অন্য কোনো কথা হবে না। সেদিন অনেক কথার পরে অফিসারকে এবং ওই মানুষটিকে বুঝিয়ে, দশ হাজার টাকার বিনিময়ে নীলাকে বাড়ী নিয়ে এল আদিত্য। বাড়ীতে ঢুকে নীলা বলেছিল, 'তুমি কিন্তু কোনো মহান কাজ করো নি। একটু বোকার মতই কাজ করলে, তোমার জায়গায় আমি থাকলে টাকা না দিয়ে বরং দুদিন জেল খেটে নিতাম।' এইকথার কোনো উত্তর দেয় নি আদিত্য। কারণ নীলাকে উত্তর দিয়ে কোনো লাভ নেই, শুধু ঝগড়া আর অশান্তি বাড়বে।

ঘটনা বহুল জীবন হঠাৎ চলতে চলতে থেমে গেলে, প্রথম দিকে একটু অস্বস্তি লাগে, ধীরে ধীরে তা গা সওয়া হয়ে যায়। আদিত্যও তার অবসর জীবন ঠিকমতো গুছিয়ে নিয়েছে। সকালে নিয়ম করে ঘুম থেকে উঠে বাজার করা, কাজের লোককে সব বুঝিয়ে দেওয়া, ছেলে মেয়ের সঙ্গে দু/একটা কুশল বিনিময়, বইপত্র পড়া, মাঝে মাঝে একটু আত্মীয়স্বজনের বাড়ী যাওয়া, সময়ে ঘুম এবং খাওয়া, সিনেমা দেখা এইভাবেই চলছে। নীলা প্রায়ই চলে যায় তার বোনের কাছে।ব্যাঙ্কের খুব কাছেই নীলার দিদি থাকে, স্বামী মারা গেছে, সন্তানাদি নেই। কিছুদিন বাদে বাদেই নীলা চলে যায় দিদির ওখানে, "ঘুরে আসি দুদিন" বলে যায়,ফিরে আসে দু/এক দিন পরে অথবা সাত আট দিন কাটিয়ে। অবসরের পরে আজ প্রায় ছ মাস এই ভাবেই চলছে। মাঝে একবার তিন দিনের জন্যে এসে আবার চলে গেছে। ভাবটা এমন, যেন সে বাড়ী এসে আদিত্যকে দয়া করেছে, বা তার কিছু যায় আসে না,শুধু একজন বোকা মানুষকে নিয়ে ঘর করতে হয়, তাই আসা।

আদিত্য তাকিয়ে আছে নীলার চলে যাবার পথে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে ভাবে, একবার হয়তো পিছন ফিরে তাকাবে নীলা। দিনের পরে দিন যায়, নীলা চলে যায় নিজের পথে, পিছনে থেকে যায় আদিত্য।মনে মনে ভাবে -- 'তুমি

ভালোবাসো নি নীলা, তাই পারো নি বিশ্বস্ত হতে। আমি ভালোবেসেছি বলেই, তোমার শত চেষ্টাতেও হৃদয় ভাঙে নি আমার। এতই সহজ নাকি? আজ বুঝি -- প্রথম দেখা, প্রথম কথা, প্রথম স্পর্শ সবই তোমার মোহ ছিল, আর আমার ছিল প্রত্যাশা।'

আদিত্য যদিও একজন কর্মব্যস্ত মানুষ হিসেবে নিজের কাজে কোনোদিন ফাঁকি দেয় নি, কিন্তু নিজেকে যন্ত্র তৈরী করে ফেলে নি। ছোটবেলা থেকে কবিতা লিখতে ভালোবাসে, সেই অভ্যেস আজও আছে। মনের জানালা খুলে দেবার একটা সুযোগ থাকলে মানুষ অনেককিছু সহজে মানিয়ে নিতে পারে। কখনও কাউকে মনের সব কথা বলা যায় কি? মা, বাবার কাছে আদিত্য মাঝে মাঝে যায়, এবারে বিজয়ার প্রণাম করতে আদিত্য একাই গিয়েছিল। নীলা যায় নি, সে খুবই ব্যস্ত তার অফিসের বিজয়া সম্মিলনী নিয়ে। মা একফাঁকে জানতে চাইল, "আদি তুই ভালো আছিস তো বাবা?"

কিছু প্রশ্নের উত্তর তো হয় না। আদিত্য চুপ করেই থাকলো, কিন্তু মায়েরা সব বুঝে যায়, মা একবারই বলে খুব আস্তে আস্তে, আদিত্যর দিকে তাকিয়ে

"নিজেকে ঠিক রাখিস"। বৃদ্ধা মায়ের চোখের দিকে আর তাকায় না সে। মুখে বলে, 'ভেবো না মা'। শূন্যতাই পূর্ণতা হয়ে ওঠে একদিন, জীবনের এই এক আশ্চর্য্য অঙ্ক। শূন্যের সঙ্গে কিছু যোগ বিয়োগ করে নাও, ঠিক একশো হয়ে যাবে। যুক্ত হলেও আছি, মুক্ত হলেও আছি। "আমি ঠিক আছি মা।" মা তার ছেলেকে ভালোই চেনে, তাই এরপর আর কোনো প্রশ্ন করে নি। বাবা বহু কিছু ভুলে যাওয়াতে অনেক সুবিধা। শুধু আদিত্য নীলা আর নাতি নাতনির নাম মনে আছে। মা এখনও আগের মতই, তাই চাইলেও মায়ের কাছে গোপন থাকে না কিছুই।

বাড়ী আসার পথে আদিত্য ভাবে, 'কতকিছু তোমাকে দিতে চেয়েছি নীলা, তুমি নিতে চাও নি তখন, আর আজ শুধু একটা হৃদপিন্ড ছাড়া কিছু নেই আমার। সেটাও তোমার, কিন্তু রয়েছে আমার শরীরে। এই হৃদয়ের ওঠা নামা, তার ছন্দ, তার গতি সব তোমার, একটিবার আমার পাশে বসো, ছুঁয়ে দেখ আমায়, নিজের ভিতরে আমি বেঁচে আছি শামুকের মত, শুধু অপেক্ষার দিন গুনে যাই।'

নীলা বাড়ী আসার আগেই ফিরেছে আদিত্য। নীলাও ফিরলো একটু পরে। দেখলো আদিত্য খাবার টেবিল সাজাচ্ছে, খেতে বসে নীলা নিজের যা পছন্দ সব নিয়ে খেয়ে নিল।আদিত্য ওসব গায়ে মাখে না আজকাল, শুধু একবার তাকিয়ে বললো, 'তোমার তো কাল ছুটি, বাজার করতে যাবে?' নীলা কোনো উত্তর দিলো না, আদিত্য বুঝলো, নীলার মন নেই এদিকে, কবেই বা থাকে! সে ভাবে, ---- 'মাঝে মাঝে কথা বলি আমরা, তাতে সব কথা বলা হয় না, আমিও চুপ করে থাকি, কারণ বহু না বলা কথা আছে, শুধু তুমি কখনও শুনতে চাও না তাই বলা হয় না।' নীলা ভাবে, 'বয়ে গেছে আমার বাজারে যেতে। চুলোয় যাক ঘর সংসার, যতসব ন্যাকামি। রিটায়ার করায় বেঁচেছি, থাকুক বসে ঘরে, ঢঙের কবিতা লিখুক, মরুক গে, এখন আমার যা ইচ্ছে তাই করবো, ঘরের কোনো কাজ করবো না আর।' যদিও নীলা কোনোদিন সংসারের ঝামেলা নিজের ঘাড়ে নেয় নি, তবুও তার মনে হয় আদিত্য রিটায়ার করার ফলে সে একটু ঝাড়া হাত পা হয়েছে।

সকালে উঠে নীলা ভাবে, 'আজ সারাদিন রঘুদা, বিদিশা আর চিন্টুকে নিয়ে ঘুরবো, ফুর্তি করবো, একদম রাতে ফিরবো যদি ইচ্ছে করে।'

নিজে তৈরী হয়ে অন্তুকে ফোনে ডেকে নিয়ে বেরিয়ে পরে। বাইরে কোথাও গেলে অন্তুকে সঙ্গে নিয়ে বেরোয় নীলা। বছর দশেকের ছোট, অবিবাহিত কিছুটা নীলার ভাইয়ের মত। একটু ভরসা করে এর উপরে নীলা। আদিত্য এইসব একটু বুঝলেও, মুখে কিছুই বলে না। নীলার কোনো ব্যাপারেই আদিত্য তেমন কোনো খবরদারি করে না। এই বিষয়টা নীলাকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। অবাধে যা খুশী তাই করার কোনো বাধা নেই, আর বাধা দিলেই বা মানছে কে?

দিদি একবার বলেছিল, 'যেদিন আদিত্য আমাদের বাড়ীতে প্রথম এসেছিল, সেদিন বাবা আর মা কি যে খুশী হয়েছিল, আমি আজও ভুলি নি নীলা, গায়ের রঙ মাঝারি, লম্বা মেদহীন শরীর, চোখে রিমলেস চশমা। বাবা বলেছিল, এত স্নিগ্ধ চেহারা যার, সে মানুষ নিশ্চয়ই ভালো। আর মা বলেছিল, ছেলেটির হাসি বড় সুন্দর। তুই খালি ওর নিন্দে করিস, বুঝি না তোর কথা। কিন্তু এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না, তোকে ও স্নেহ করে, ভালোবাসে, তোর জীবন যাপনে অবাধ স্বাধীনতা আছে, আর তুই সেই স্বাধীনতাকে স্বেচ্ছাচারিতায় নিয়ে গিয়েছিস। একদিন হয়তো তোর বোধোদয় হবে।' নীলা দিদির কথাকে তেমন পাত্তা দেয় নি সেদিন, আজও দেয় না।

ইদানিং একটু অন্যরকম লাগলেও উদ্দাম জীবনের হাতছানি থেকে নীলা বেরোতে চায় না। আজ সবাই মিলে চলে এসেছে রঘুদার জ্যেঠুর বাগানবাড়ীতে। সেখানে সবকিছু ঠিক ছিল, কিন্তু দুপুরে খাবার সময় আসাবধানে একটা চিনে মাটির প্লেট ভেঙে ফেললো নীলা, আর ঠিক সেই সময় চিন্টু নীলার গালে একটা চড় মারলো, এরপর নীলাও মারলো। হাতাহাতি থামলো, কিন্তু একটু তাল কাটলো, রাতে বাড়ী ফিরে নীলা আজ আদিত্যর সঙ্গে দু/একটা আজে বাজে কথা বলে শুতে গেল।

মেয়েদের মন তো কেউই বোঝে না। কার মনে কি আছে, কে তার খবর রাখে! সকালে উঠে আজ নীলা চা খেতে বসেছে, আদিত্য চা খেতে খেতে ফোনে ছেলের সঙ্গে কথা বলছিল, নীলা ইচ্ছে করেই চায়ের কাপ এবং প্লেট ফেলে দিল আর সেগুলো ভেঙে গেল। আদিত্য সব ফেলে এসে নীলাকে ধরে বললো, 'তুমি ঠিক আছ তো? লাগে নি তো?'

---- এগুলো সেবারে নেপাল থেকে আনা। 'তোমার আবার শখের জিনিস' কথার ভিতরের খোঁচাটুকু গায়ে না মেখে আদিত্য বললো,

---- যে কোনো জিনিসের থেকে তোমার মূল্যটা তো বেশী।

আর কথা না বলে আদিত্য আনমনা হয়ে গেল।

মনের ভাবনা তাকে জড়িয়ে ধরলো। 'মন আমার হারালি কোথায়? খুঁজে দেখ না নিজের প্রাণে। ফুলের বাগানে ফুল ঝরে যায়, কে নিল তুলে মাথার খোঁপায়।'

শেষ বিকেলের আলোয় নীলাকে প্রথম দেখে আদিত্যর মনের হয়েছিল, 'এই তো সেই মেয়ে, যার সঙ্গে পাশাপাশি অনেক পথ হেঁটে চলে যাওয়া যায়, অনেক দূর।' এখনও মাঝে মাঝে আদিত্য স্বপ্ন দেখে, চেতনে অচেতনে বেলা অবেলায় সুখ দুঃখের দিন যাপন। নাহয় এভাবেই চলুক। মন্দ কি?

আদিত্যকে বিয়ে করে নীলা যে খুব বিরক্ত, সে কথা নীলার ব্যবহারে স্পষ্ট থাকে।আদিত্য লক্ষ্য করেছে নীলা বাড়ীতে থাকতেই চায় না আজকাল শুধু খাওয়া এবং শোয়ার জন্যে সে বাড়ী আসে, কোনো ভাবে রাতটুকু পার

করেই বেরোতে পারলে বাঁচে। টাকা থাকলে আজকের পৃথিবীতে নিজের ইচ্ছে মতন থাকা বা খাওয়ার অসুবিধে তো হবার কথাই নয়।আসলে দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে বসবাস করলে বোধহয়, একই মানুষকে আর ভালো লাগে না। শারীরিক এবং মানসিক কোনো টানই আর থাকে না। নীলার সংসারে মন নেই, ছেলে মেয়ে, নিজের বর সব কিছু তার কাছে বোঝা।

নীলা মাঝে মাঝেই তার দিদির কাছে আসে। দিদি যে তার জীবনে বিরাট কিছু তা নয়, কিন্তু একটা আসার জায়গা, আসতে পারে যখন তখন তাই আসে। দিদি জ্ঞান দিলে ভালো লাগে না। তবে নিজের কথা কদাচিৎ বলে। যেমন আজ বললো, যখন দিদি জানতে চাইল, 'তোর কি হয়েছে?'

---- 'বেশী দেখায় বলেই আদিত্যর সঙ্গে থাকতে আমার ভালো লাগে না। বিয়ের পর থেকেই দেখছি, সব সময় দেখনদারি, আমি কিছু বললেই সেটা করার জন্যে ব্যস্ত। প্রেম প্রীতি আমার পোষায় না একদম। বিয়ে করেছি, সন্তানের জন্ম দিয়েছি, নিজে চাকরী করি, আমি কারো পরোয়া করি না। ছেলে মেয়ে নিয়ে আদিখ্যেতা দেখলেই বিরক্ত লাগে। ওরা যা খুশী করুক, যেমন ইচ্ছে বাচুঁক মরুক গিয়ে, তাতে আমার কি? আমি ভালো ভালো খাবো, পরবো, যা ইচ্ছে তাই করবো, কারো কথা শুনবোই না। আমি কারো অধীন নই। কারো খাই না আর পরিও না। কে খেল, কে মরলো, ওসবে আমার কি? আমি একা ভালো থাকবো, বাকী সবাই আমার পায়ের তলায় থাকলে থাকুক, না থাকলে রাস্তা দেখুক। কারো ধার ধারি না আমি।' দিদি নীলার দিকে তাকিয়ে রইলো, কিন্তু কোনো কথা বললো না। শুধু নিজের পুরোনো দিনের কথা মনে পড়লো, 'স্বামী থাকার সময় তার দিনগুলো খুব তাড়াতাড়ি কেটে যেত।সন্তান হয় নি ঠিকই কিন্তু তাতে একে অপরের প্রতি স্নেহ ভালোবাসা কম ছিল না। মনে মনে ভাবলো, "আমরা একসঙ্গে সংসার করি, থাকি, খাই, ঝগড়া করি, ভালোবাসি, কিন্তু কেউ জানতে পারি না, কবে, কখন হঠাৎ একদিন আলাদা আর একদম একা হয়ে যাব আমরা। কোনোদিনও আর দেখা হবে না, চাইলেও ফিরে আসবে না কেউ।'

আদিত্য এতটা ভাবে নি বিয়ের আগে। নীলাকে সে চিনতো, জানতো কিন্তু বোঝে নি তেমন ভাবে। এত জটিল একটা মানুষ হতে পারে? আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে হলেও তেমন কোনো বদগুণ ছিল না আদিত্যর। সৎ, মিশুকে, হাসি খুশী একটি ছেলে ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে শুরু করলো নীলার সান্নিধ্যে।

আজ সকালেই নীলা বেরিয়ে গেছে কোথায় যেন মিটিং আছে বলে। রবিবারও কাজের অছিলায় সে বেরিয়ে যায়, ফোনের কথায় আদিত্য বোঝে, তেমন জরুরী বিষয় নয়, কিছুটা ইচ্ছে করেই নীলা বেরিয়ে গেল। মানে বাড়ীর কোনো দায়িত্ব সে নেবে না। ফিরবে নিজের ইচ্ছে মত, ফিরে স্নান সেরে খাবে অথবা খাবে না, নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে সুখের ঘুম দেবে। অকারণ কিছু মিথ্যে এবং বানানো কথা বলবে, ইচ্ছে না থাকলেও আদিত্যকে সেগুলো বসে শুনতে হবে, অযথা হ্যাঁ বা না বলতে হবে। না শুনলেই চিৎকার অশান্তি ঝগড়া আরম্ভ করবে নীলা। কারণ আদিত্য জানে একমাত্র চিৎকার করেই সে জিতে যাবে।

নীলা নিজের স্বার্থ ছাড়া কারো কিছু বোঝে না আর বোঝার চেষ্টাও করে না।সে কিছুদিন মেয়ের বাড়ী গিয়ে রইলো। দেখলো তার মেয়ে বা জামাই তার প্রতি খেয়াল রাখে,অযত্ন করে না মোটেই। তবুও তার মনে হয়, এরা তাকে পাত্তা দিচ্ছে না তেমন। নিজের মনের জ্বালায় সে সর্বদাই জ্বলছে। কিছুতেই সুখ নেই।

মানুষের মনের কিছু কিছু জায়গা মনে হয় অন্ধকারেই থাকে। সেখানে কোনো আলো পৌঁছয় না। মানে ইচ্ছে থাকলেও ওইখানে আলো বোধহয় নিজেই যেতে চায় না। ঠিক যেমন কিছু লোক সারাজীবন অসন্তোষ নিয়ে বাঁচে।

আদিত্য আর নীলাও এমনি অদ্ভুত এক অসুখে ভুগছে। বছর চারেক হলো, এদের জীবনে যেন সুখ আর আসতে পারছেই না। আনন্দ মুখ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে। এরা একে অন্যের দয়ার উপরে নির্ভর করে বেঁচে আছে। অর্থাৎ যে কদিন বাঁচি, এভাবেই যেন বাঁচবো। এই সার বোঝা বুঝেও এরা নিজেদের মধ্যে প্রতিদিন দূরত্ব বজায় রাখা, ঝগড়া করা, একে অন্যকে দোষারোপ করা চালিয়ে যাচ্ছে। টাকা পয়সা নিয়ে ভাবনা নেই বলেই হয়তো, এদের একজন অন্যজন কে খুব বেশী সহ্য করতে পারে না।

আদিত্য নিজের বাড়ীতে ফিরে শান্তিতেই ছিল।

সেদিন সন্ধ্যের পর অফিস থেকে বাড়ী এসেই নীলা ঘোষণা করে দিল, সে বেড়াতে যাচ্ছে কাল অনুজাদি আর সুমিতার সঙ্গে অরুণাচল প্রদেশে। শুনে আদিত্য বললো, 'ওখানে কিন্তু ঠান্ডা এখন, তোমার কষ্ট হতে পারে।' উত্তর এল '----আমি ছেলেমানুষ নই,তোমার এত না ভাবলেও চলবে, আর আমাকে ফোন একদম করবে না, খুব বিরক্ত লাগে।'

একদিন দুদিন তিনদিন চলে গেলেও ফোন করে নি আদিত্য। ধুসর, ক্লান্ত, অভিমানী আর রহস্যময় হেমন্তের দিন পেরিয়ে রাত আসে, নিস্তব্ধতার প্রহর গুনে চলে আদিত্যর চেতনা। মনে পড়ে যায় জীবনানন্দ। "হেমন্ত ফুরায়ে গেছে পৃথিবীর ভাঁড়ারের থেকে : / এরকম অনেক হেমন্ত ফুরায়েছে / সময়ের কুয়াশায় : / মাঠের ফসলগুলো বার - বার ঘরে / তোলা হ'তে গিয়ে তবু সমুদ্রের পারের বন্দরে / পরিচ্ছন্নভাবে চ'লে গেছে।" নিজেকে সামলে নেয় সে।

আট দিন পরে ছেলে বাবাই ফোন করে জানায়, নীলা অসুস্থ হয়ে হোটেলেই আছে। বন্ধুরা ফিরে গেছে গতকাল, নীলার ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে, বেশী রকম অসুস্থ, বাবাই গিয়ে আনতে পারবে না তাকে, তার সময় নেই।

আদিত্যকে নিজের সামনে দেখে নীলা মুখ ফিরিয়ে রইলো, কিন্তু এও বুঝলো, তার মনের ভাবনা শেষ হলো, সে যে নিরাপদে নিজের ঘরে ফিরে যাবে, তাতে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

অবশেষে বাড়ী ফিরলো দুজনে। নীলা কিছুদিন হলো বাড়ীতেই আছে। কিন্তু কথা বিশেষ বলে না, চুপচাপ থাকে।

আদিত্য মনে মনে বলে, 'নিজের সুখের জন্যই যারা বাঁচে নীলা সেই দলের মানুষ। নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে সুন্দর করে রাখা, জীবনকে উপভোগ করাও তো একধরণের সাধনা। ব্যক্তিগত সুখভোগ, পারিবারিক জীবন, নিশ্চিন্ত আশ্রয় এর বাইরে তার ভাবনা নেই বলে তাকে দোষ তো দেওয়া যায় না।'

নীলা আজ প্রায় একমাস হলো বাড়ীতেই আছে। আর কয়েকদিন পরেই, পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে কাজে যাবে। সে ভাবছে, আদিত্য কেমন পুরুষ কে জানে! সারাজীবন বউ ছেলে মেয়ে আর সংসার নিয়েই ভেবে মরলো, এর নাম জীবন? ভালো ব্যবহার, ভদ্র শান্ত, বিনয়ী হলেই পৌরুষ দেখানো হয়? এমন বোকা হাবা একটা লোকের সঙ্গে সে থাকে, একথা যখনি ভাবে, তখনি ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হয়, অসহ্য লাগে, মাঝে মাঝে মনে হয়, আদিত্যকে খুন করে ফেলতে পারলেই সে বাঁচে।

এই লোকটার কথায় ভুলে বিয়ে করেছিল সে, তার বাবা মা সবাইকে টুপি পরিয়েছে ভালোমানুষী দেখিয়ে। ভাই বোন সংখ্যায় একটু বেশী ছিল বলে বাবা তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিল।

সময় কারো জন্যে অপেক্ষা করে না। এক শীতের বিকেলে কোনো এক কবি সম্মেলনে আদিত্য কবি হিসেবে সম্মানিত হয়ে ঘরে ফিরেছে। নীলা কোনোদিনও এই সব খবর রাখে না। আজ ছেলে ফোন করে জানিয়েছে বলেই সে জেনেছে। আদিত্য কখনও এই প্রসঙ্গে কোনো কথা বাড়ীতে বলে না।সে জানে, তার কবিতা লেখার বিষয়টা নীলা অত্যন্ত খারাপ চোখে দেখে।পরেরদিন ব্যাঙ্কে সকলেই নীলাকে অভিনন্দন জানালো। নীলাও শুনলো, হাসলো। বাড়ীতে সে একটিও কথা বলে নি ছেলে মেয়ে বা আদিত্যকে।

বাবাই আর লিলি দুজনেই ফোন করে আসতে চাইলো তাদের বাবার কাছে, আদিত্য বলেছে, ক'টাদিন পরে আসতে, এখন প্রতিদিন কিছু কিছু মানুষ তো আসেই। বেশ কিছুদিন পরে একদিন ওরা এল, নীলা আজ নেই, ছুটির দিন বলে কয়েকজন মিলে কোথাও বেড়াতে গেছে। এইটা এবাড়ীতে এতই স্বাভাবিক যে, কারো কিছু মনেই হয় না।

---- মা কিছু বললো বাবা?

---- না রে।

---- মা যেন কেমন বাবা!

---- তোমাদের মায়ের কোনো দোষ নেই। তোমরা বড় হয়েছ, বলতে তো আর বাধা নেই। মানুষ হিসেবে কোথাও কিছু অপূর্ণতা তো আমারও আছে, সেটা হয়তো ওকে কষ্ট দেয়, ওর সমালোচনা করে কি হবে, ও তো এই পরিবারে এসেছে নিজের ইচ্ছেতে।

---- মা কে তো ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, মা কোনো দায়িত্ব নিতে চায় না, কিন্তু সংসার করতে হলে কিছু তো কাজ করতে হয় বাবা।

---- হ্যাঁ, তোমাদের কথা ঠিক, কিন্তু সব মানুষ যে সমান হয় না, এটাও তো ঠিক।

---- তুমি কেন মা কে কখনও কিছু বলো না? তোমার খারাপ লাগে না বাবা?

---- লাগে তো, আমার কষ্টও হয়, কিন্তু আমি কিছু বলি না, তার কারণ হলো, আমি মনে করি, অন্যকে দুঃখ দেওয়া বা দুটো খারাপ কথা বলা খুব সোজা,নীলাকে অপমান করা, বাড়ী থেকে বের করে দেওয়া এগুলো তো করতেই পারতাম, সাধারণ মানুষ আমরা সবাই, সারা পৃথিবীর মানুষ তো তাই করে, কিন্তু নিজেকে নিজের মত করে খুশী রাখা খুব কঠিন। আমি সেই কাজটাই আজীবন করে যাচ্ছি। আমার মত মানুষও এই পৃথিবীতেই থাকে, যারা নিজেকে এই সব থেকে দুরে রেখে বেঁচে আছে।

---- মা কোনো অসুবিধায় পড়লে তুমি ছুটে যাও, অথচ তোমার খুশীর দিনে মা ফিরেও তাকায় না, আমাদের খুব খারাপ লাগে।

---- তোমার কোনোদিন মনে হয় নি বাবা, তুমি একটা ভুল জীবন নিয়ে বেঁচে আছ?

---- স্বীকৃতি পাওয়া তো সবসময় লক্ষ্য হয় না লিলি। না পাওয়াটাও একরকম পাওয়া, এটা তো বোঝো। কাউকে ধরে না রেখে ছেড়ে দেওয়াটাও একধরণের ধরে রাখা। যে মন চায় না অন্য মনের সঙ্গ, যে হাত ধরতে চায় না

কোনো হাত, যে ভালোবাসা শুধু ভালো থাকার সুযোগ খোঁজে, যে সম্পর্ক থেকেও নেই, সেখানে আমার জীবনটাই তো মৃত, এই মৃত্যুই আমার জীবন।

সন্ধ্যের পর নীলা ফিরে এসেছে বাড়ীতে হাতে মিষ্টির প্যাকেট। সবাই অবাক চোখে নীলার দিকে তাকিয়ে।সে বাবাই এর হাতে মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে বলে,।

---- নাও, সবাই খাও তোমরা।

---- সেই যখন আনলে, বাবার পছন্দের মিষ্টিটাই আনতে।

---- তোমার বাবা খাবে ভেবে আনি নি আমি। এটা আমি খাবো, আমার পছন্দ,আমি অন্য কারো কথা ভাবতে বাধ্য নই,এটাই শেষ কথা।

এরপর সকলেই চুপ করে রইলো। মিষ্টি সবাই খেলো, আদিত্যও খেলো। একটু পরে ছেলে মেয়ে চলে গেল, ওদেরও তো সংসার আছে, এসেছিল আনন্দে শরিক হতে। ওরা ওদের বাবা মাকে ভালোই বাসে, কিন্তু খুব স্বাভাবিক ভাবেই মায়ের থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলতেই হয়।

অনেক রাতে ঘুম ভেঙে যায় আদিত্যর, সে দেখে নীলা খেতে বসেছে। বাড়ী ফিরে সে খায় নি, তাই আদিত্য খেয়ে শুয়ে পড়েছিল।আদিত্য উঠে এসে বলে, "তখন খেয়ে নিলেই পারতে।"

---- তোমার ছেলে মেয়ে আর তোমার কবিতা নিয়ে মাতামাতি এত বেশী যে, ঘরে তো শান্তি নেই, খাবো কি?

---- আচ্ছা, খেয়ে নাও, আমি যাচ্ছি।

অঘ্রানের ঠান্ডা হাওয়ায় শরীর খারাপ হতে পারে জেনেও, আদিত্য জানলা খুলে দেয়, অন্ধকারে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে, এত বড় আকাশটাও তো এত অন্ধকার নিয়ে একইরকম আছে, যেদিন চাঁদের আলোয় ভরে যাবে, সেদিন তো আর ভাবনা থাকবে না।

'সুন্দর এই মায়াময় পৃথিবীতে তুমি অসম্ভব জীবন্ত নীলা।

ফুল পাখী গান নদী ঊষড় মরুভূমি গহন অরণ্য

অশান্ত সমুদ্রের মত তুমি আছ নিজের মত।

আমি আছি মৃত্যুর মত এক শীতল জীবন নিয়ে।

যে জীবনে তেমন তৃষ্ণা নেই, আছে বন্ধনহীন এক গ্রন্থি, যেখানে অবিরল মৃত্যুর হাতছানি আছে, আছে নিস্তব্ধ নিশ্চুপ থমকে থাকা। তবুও মৃত্যু না থাকলে জীবন এত মধুর হয় না।

প্রজ্ঞাপারমিতা রায়


About the Author:

Prajna Paramita Roy earned her Master’s degree in Bangla from Visva-Bharati University, Santiniketan. Deeply inspired by Rabindranath Tagore’s ideals, she has dedicated over three decades to teaching Bangla Literature and Language, instilling in her students a holistic approach to education that blends knowledge with creativity and sensitivity. Based in Kolkata, she nurtures a lifelong passion for both teaching and music.




Comments & Related Articles

Read more reflections on life, art, and the human spirit from our contributors.

Ganga Zuari International: Connecting Cultures Across the Globe

Join us in promoting cross-cultural dialogue, preserving heritage, and fostering global collaborations through art, literature, music, and festivals.

Latest Events View Activities
Blog - Mélange Read Articles